পেশাদার প্রতিবাদী

pramatta manan post (10)

আমার খুব কাছ থেকে দেখা এক ঘটনা উল্লেখ করি। আমার এক নিকট আত্মীয় এক প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে চাকরি করতেন কোন এক বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ আমার সেই নিকট আত্মীয় ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ওই বিদ্যালয়ে একজন সহকারি শিক্ষক ছিলেন যিনি মোটামুটি ভালো সংখ্যক শিক্ষার্থীকেই অর্থের বিনিময়ে প্রাইভেট পড়াতেন। একসময় ওই সহকারি শিক্ষক তার প্রাইভেট বানিজ্য সপ্রসারণে উদ্যোগী হলেন। তিনি প্রথান শিক্ষকের কাছে দাবী করলেন প্রাইভেট এর জন্য একটি ক্লাসরুম খুলে দিতে যাতে তিনি প্রাইভেট পড়াতে পারেন। প্রধান শিক্ষক দায়িত্বশীল মানুষ। তিনি এই আইন বিরোধী কাজে বিরোধিতা করলেন, ব্যক্তিগত কাজে সরকারী বিদ্যালয়ে্র আসবাবপত্র ব্যবহার করতে দিলেন নাহ। এবার সেই সহকারী শিক্ষক বুঝতে পারলেন প্রধান শিক্ষক থাকলে তিনি বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারবেন নাহ। তাছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্রসহ যাবতীয় বিষয় প্রধান শিক্ষক দেখাশোনা করলে তিনি কখনোই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারবেন নাহ। ওই প্রতিষ্ঠানে প্রথম প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন ওই অধিনস্থ সহকারী শিক্ষকই। বিভিন্ন মহলে সুযোগ পেলেই প্রধান শিক্ষকের নামে দুর্নাম করলেন, প্রধান শিক্ষককে বেকায়দায় ফেলার চেস্টা করলেন, এই আশায় যে প্রধান শিক্ষককে নিবৃত করতে পারলে উনি হতে পারবেন প্রতিষ্ঠানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আদতে তার প্রতিবাদ যে ছিল প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার প্রচেস্টা, নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করার প্রচেস্টা।

আমার দেশে মানুষ ঠিক দুটো কারনে প্রতিবাদী হয়। হয়তো নিজ স্বার্থ ক্ষুন্য হলে, নয়তো লাইম লাইটে আসার আশায়। লাইম লাইটে আসতে পারলে তারা সোস্যাল আর মূলধারা (mainstream) মিডিয়ায় একটি জীবিকা তৈরি করতে পারবে। জনগনের মনোযোগ পায় এরকম কোন কিছুই ব্যবসায়িক জগতের জন্য ভালো, আর এজন্যই হয়তো টক্সিক কালচারগুলো এদেশে পৃষ্ঠপোষকতা পায়। অপরপক্ষে সুস্থ চিন্তার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লেখকগন এখানে উপেক্ষিতই হয়। আলোচনায় না আসার জন্য মূলধারা (mainstream) মিডিয়ার যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা তারা কখনোই পায় নাহ। যথেষ্ট ফ্যান, ফলোয়ার, অনুসারী না থাকার দরুন সোস্যাল বা মূলধারা (mainstream) মিডিয়ায় তাদের অর্জনের খাতাটা শুন্যই থাকে।

আবার এদেশে এখন আরেকটি সহজ ব্যবসা প্রতিবাদী হওয়া। আপনার যখন যথেষ্ট অর্জন না থাকবে, দায়িত্ব না থাকবে তখন আপনি দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে পেশাদার প্রতিবাদী হতে পারেন। প্রতিবাদী হলে আইন শৃঙ্খলা ভাঙার একটা সুযোগ তৈরি হয়, ব্যক্তিগত অর্জন শুন্য হলেও দায়িত্বশীলদের দিকে আঙ্গুল তোলা যায়, দিনশেষে গনমানুষের নেতা হওয়া যায়। রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে গেলেও, প্রতিবাদী হিসেবে রাষ্ট্র অকার্যকর করার দায়ভার এড়িয়ে দায়িত্বশীলদের দিকেই তীর ছোড়া যায়। এরপর যোগ্যতার খাতায় শুধু সামনের সারির প্রতিবাদী হিসেবে খবরের হেডলাইনে আসা যায়, রাতারাতি গন্যমান্য ব্যক্তি হওয়া যায়। এই গন্যমান্য ব্যক্তি হতে দান সদকা দেওয়া লাগে নাহ, অর্থ খরচ করতে হয় নাহ, বিদ্যা বুদ্ধি লাগে নাহ, সারাদিন কস্ট করে কোন গবেষণাপত্রও লেখার প্রয়োজন হয় নাহ। যথেষ্ট অর্জন না থাকায়, নিজের কখনো দায়িত্বশীল পদে আসীন হবার ভয় থাকে নাহ। তাই এই এক পেশা, যেটাকে আমরা বলি প্রতিবাদী পেশা, এই পেশায় অনন্তকাল পার করা যায় যথোপযুক্ত জবাবদিহিতা ছাড়া। এখানে জবাব দেওয়ার দায় তো শুধু দায়িত্বশীলদের। দায়িত্বশীলদের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার পরও, সেটা যথোপযুক্ত হয়নি বলে প্রত্যাখ্যান করা যায়। উপরুন্ত অপূরণযোগ্য দাবী দাওয়া শর্ত জুড়ে দিয়ে প্রতিবাদকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এতে প্রতিবাদী পেশায়ও প্রমোশনের সম্ভাবনা বাড়ে।

end of reading 1

Leave a Reply