
গায়ে গন্ধ, দেখতে বিশ্রী, কপালে টিপ, গোসল করেনা ইত্যাদি কথাগুলো নতুন হলেও প্রতিপক্ষ ব্লেমিং/ট্যাগিং এর এই কালচারটা কিন্তু আমাদের দেশে বহু পুরনো। যখন যুক্তি তর্ক কাজে আসে নাহ, তখন এই ট্যাগিং কালচার দিয়ে ভিন্নমতকে সহজেই ঘায়েল করা যায়, তাদের দাবী দাওয়া যুক্তি তর্ক উপেক্ষা করে তুচ্ছ দেখানো যায়, সেটা আমার দেশের মানুষ ভালোই জানে। উপরন্তু এটা এদেশের রাজনীতির জগতে সচরাচরই দেখা যায়।
সে যাই হোক, এখন কথা বলি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ নিয়ে। মানুষ তার অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে প্রতিবাদী হবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। অতীতেও এটা হয়ে এসেছে। সেক্ষেত্রে তাদের অধিকারের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসতে পারতো। সেখানে পক্ষ বিপক্ষের যুক্তি আসতে পারতো। বর্ং সভ্য সমাজ জনগোষ্ঠীতে এটাই ছিল স্বাভাবিকতা, অতীতেও তো এমনই হয়েছে। কিন্তু এখানে সেটা হয়নি। আলোচনায় এসেছে এসব মেয়ের গায়ে গন্ধ, দেখতে বিশ্রী, কপালে টিপ, গোসল করেনা, তাদের কোনো পুরুষ বিয়ে করবে কিনা, এসব বাজে কথাবার্তা। এখানে পুনরায় অতীতের ন্যায় সেই “শাহবাগী” ট্যাগ লাগানো হয়েছে। আলোচনার বিষয় বস্তুকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিবাদের বিষয়বস্তু থেকে প্রতিবাদকারীদের দিকে।
নিপীড়িত হলে প্রতিবাদ করাটা মানুষের মৌলিক অধিকার এটাই জেনে এসেছি চিরকাল ধরে। সেখানে প্রতিবাদীকে দেখতে সুন্দর বা সুশ্রী হতে হবে সেটা জানা হয়নি কখনো। প্রতিবাদ করতে হলে গোসল করে আসতে হবে, তাদের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পোষাক পরিচ্ছদ পরতে হবে, নয়তো তাদের ট্রলের শিকার হতে হবে এসব কিছুর চর্চা আজকাল বড্ড বেশি দেখি নব্য মিডিয়ায়। অথচ প্রতিবাদের অধিকার তো সেই এসিডে ঝলসে যাওয়া মেয়েটা থেকে শুরু করে দাঁড়ি টুপি পরিহিত সেই মৌলোভীটাও রাখে, এমনটাই তো হওয়া উচিত ছিল। এখানে তো তার সুশ্রী হওয়াটা মুখ্য বিষয় হবার কথা ছিলো নাহ কখনো। এখানে প্রতিবাদের কারনটাই মুখ্য আলোচনার বিষয় হবার কথা ছিল, প্রতিবাদী দেখতে কেমন সেই বিষয়টি নয়।
শিশুকাল থেকেই দেখে এসেছি এদেশে কিছু মানুষ রাস্তার পাশে দেওয়ালে প্রস্রাব করে, কিছু পুরুষ পাবলিক প্লেসে সিগারেট খায়। কিন্তু এই সোস্যাল মিডিয়া হ্যারেসার বা ট্যাগবাজ মব ‘রা কিন্তু সেক্ষেত্রে কখনো কোন ট্যাগ লাগানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। একটা বৃহৎ অংশ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা মানুষও কিন্তু এই সোস্যাল মিডিয়া ট্যাগবাজ মবদের অন্তর্ভুক্ত। অনেকের ক্ষেত্রে এই মবদের সোস্যাল মিডিয়া খুটে দেখলে খুব ভালো পরিমান পর্ণ আসক্তি ব্যপারটাও কিন্তু লক্ষ্য করা যায়। অনেকসময় এদের কাছে কোন ট্যাগ লাগানো “শাহবাগী” মেয়ের ইনবক্সে নিজের পুরুষাঙ্গের ছবি পাঠানোও বিশাল সাফল্যের ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সেসব অপরাধে ট্যাগবাজদের কোন ট্যাগ লাগানোর প্রয়োজন আসে নাহ, হয়তো সেটাকে যথাযোগ্য অপরাধ হিসেবে মানাটাও তাদের কাছে কষ্টকর ব্যাপার। কারন আদতে এই ট্যাগগুলো তো ভিন্নমতকে দমন করার জন্য, যাতে ভিন্নমত প্রতিবাদ করতে না পারে, সাহস না পায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের জাজমেন্টের দ্বারা এই ভিন্নমত কে লজ্জিত করা যায়।
তবে এই ট্যাগিং বা সোস্যাল মিডিয়া হ্যারেসিং কালচার কি কখনো এই প্রতিবাদগুলোকে নিরব করতে সক্ষম হয়েছে? সক্ষম হয়নি, কারন এই সোস্যাল মিডিয়া হ্যারেসার মবটা কখনো সেই প্রতিবাদের বিপরীতে যুক্তি তর্কে আসতে চায়নি। এখানে সঠিক বেঠিক কোন মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠেনি। এখানে মুখ্য বিষয় ছিল প্রতিবাদের ন্যারেটিভ পরিবর্তন করা, ট্যাগ লাগানো, সামাজিকভাবে ট্রল করা। সেই প্রতিবাদী মেয়েগুলোকে আলোচনায় আনা, তাদের লজ্জিত করা আর প্রতিবাদের বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া। সুদুরপ্রসারী কোন সমাধান এই সোস্যাল মিডিয়া হ্যারেসাররা খোজেনি তাই প্রতিবাদের বিষয়টা এড়িয়ে যেতে পারেনি নি। বরং সেটা ফিরে এসেছে বার বার।
