বল্টু খোলা মস্তিষ্ক

সালটা তখন ২০২২। সে সময় পদ্মা সেতুর সবেমাত্র উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধনের পরদিনই সেতুকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য। সেটা তো খুব ভালো কথা। পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই, ভাবনারও শেষ নাই। তবে পদ্মা সেতু নিয়ে সবথেকে ইউনিক বা দুর্লভ ভাবনা এসেছিল হয়তো বায়োজিদ সাহেবের মাথায়। তার চিন্তা ভাবনার দূরত্ব এতই দুর্লভ ছিল যা হয়তো এই দেশের কারো মস্তিষ্কেই আসেনি। তো কি ছিল সেই বদবুদ্ধি সাহেবের (ভাই সাহেবকে ছদ্মনামেই ডাকলাম) দুর্লভ মস্তিষ্কের যুগান্তকারী পরিকল্পনা? উন্মুক্ত করার দ্বিতীয় দিনই সেই বদবুদ্ধি সাহেব ছুটে গেলেন পদ্মা সেতুতে। বহু উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে পদ্মা সেতুর নাট বল্টু খুলে ভিডিও তৈরি করলেন এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার আশায় যে, পদ্মা সেতু যথেষ্ট পাকাপোক্ত হয়নি, ভেঙ্গে যাবে, ইঞ্জিনিয়ারগুলো সব হতচ্ছাড়া, জনগনের টাকা বেহাত হয়েছে। তবে জনাব বদবুদ্ধি সাহেবের এই দুর্লভ বুদ্ধি তার অনুসারীদের মধ্যে বহুত আলোড়ন সৃষ্টি করলো। সস্তা সোস্যাল মিডিয়ায় সমগোত্রীয় বল্টু খোলা মস্তিষ্কের মানবদের মাঝে তা ভীষণ প্রশংসিত হলো। কেউ কেউ তা দেখে জনাব বদবুদ্ধির বুদ্ধির প্রশংসা করে ইঞ্জিনিয়ারদের দুই চারটা গালি দিয়ে দেশের অনেক উপকার করলো। কিছু লোক উপাধিও দিলো এগুলো অটোপাশ ইঞ্জিনিয়ার। আবার অনেকে অনেক যুক্তি দাড় করলো, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবগন যখন বল্টু যথেষ্ট টাইট করেনি এর পিছনে নিশ্চই কোন কারন আছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, কিশোর-যুবক মোটামুটি অনেকেই সেতু বিশেষজ্ঞ হয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত পেশ করলো। শেষমেস ইঞ্জিনিয়ারগন সংবাদপত্রকে জানাতে বাধ্য হলো তারা আসলে জনগনের সুবিধার্থে কিছু কাজ বাকি থাকলেও আগেভাগেই সেতুকে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তাদের মাথায়ও আসেনি জনাব বদবুদ্ধির মত কেউ সেতুতে গিয়ে বল্টু খুলে সেটার ভিডিও বানাবে। তবে সরকার মহোদয় জনাব বদবুদ্ধির এই দুর্লভ কৃতিত্বকে ভালোভাবে নেয়নি। তাদের এতদিনের সেতু নির্মাণের কৃতিত্বের সিঙ্গারা যে বদবুদ্ধি সাহেব একাই খেয়ে ফেলেছেন। তাই বদবুদ্ধি সাহেবের বল্টু খোলা মস্তিষ্ককে মানসিক সমস্যা ঘোষণা করে হাসপাতালে (জেলখানায়) পাঠানো হলো। সেখানে তার কি চিকিৎসা চললো জাতি হয়তো তা আর কোনদিন জানবে নাহ।

সে যাই হোক, বদবুদ্ধি সাহেবকে চিকিৎসায় পাঠিয়ে বল্টু খোলা মস্তিষ্কের বিলোপ ঘটানো সম্ভব হয়নি। এই সংক্রমণ যেহেতু জনাব বদবুদ্ধি সাহেবের আবির্ভাবের পূর্বেও জনসাধারনের মধ্যে ছিল, তা এখন বহু অংশে ছোয়াচে অসুখের মত আরো সংক্রামিত হয়েছে। এখন কিন্তু যত্রতত্রই একদল বল্টু খোলা মস্তকধারীর উদয় হয়। রাস্তা ঘাট, চায়ের দোকান, স্কুল কলেজ, সোস্যাল মিডিয়া, সবখানেই আর কিছু থাকুক নাই থাকুক বল্টু খোলা মস্তিষ্কধারীরা বহাল তবিয়াতেই আছে। এই তো সেদিন চায়ের দোকানী জনৈক মনিলাল সাহেবের সাথে সাক্ষাত হলো। ভদ্রলোক জীবিকা হিসেবে ভাইয়ের দোকানেই মুদি সদয় বিক্রি করেই দিন অতিবাহিত করেন। সাক্ষাতে তার নিকট থেকে জানতে পারলাম তার ভাগিনা এইচএসসি পাশ করে কোন এক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরী নিয়ে বিরাট বড় অফিসার। তাচ্ছিল্য স্বরে বললেন প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর না করে তার ভাগিনার সাথে এইচএসসি পাশ করে চাকরি করলে বিরাট বড় অফিসার হওয়া যেত, তাতেই জীবনের সার্থকতা আসতো। ব্যাপারটা নিয়ে ভদ্রলোক বেশ আত্মবিশ্বাসী, গর্ব নিয়েই প্রচার করতে ছিলেন। প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর আর সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে এইচএসসি পাশের পার্থক্যটা তাকে বুঝানো যে নিজের মস্তিষ্ককে কিছু সময়ের জন্য জেলহাজতে সশ্রম কারাদন্ডে পাঠানোর মত কষ্টকর তা আমি সেদিন খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছি।

পশ্চিমারা নিজেদের জন্য বানিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, উন্নত সমরাস্ত্র, কৃত্রিম উপগ্রহ, গবেষণাকেন্দ্র আর তৃতীয় বিশ্বের বল্টু খোলা মস্তকধারীদের জন্য তৈরি করেছে সস্তা সোস্যাল মিডিয়া। সোস্যাল মিডিয়ায় আমাদের এই বল্টু খোলা মস্তকধারী বুদ্ধিজীবীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বিমান বিশেষজ্ঞ বা সাহিত্যিক বনে যায় রাতারাতি। তবে এই সোস্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের আপনি যুক্তি তর্ক ব্যাখ্যা বুঝাতে পারবেন নাহ কখনোই। সব বিষয়ে, সব ইস্যু নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে অধিক সন্যাসিতে গাজর নস্ট পরিবেশ সৃষ্টি করে।


প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও আমাদের তাতে কোন মাথাব্যাথা নেই। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষিতরা হাস্যরসের বিষয় হয় বল্টু খোলা মস্তিস্কধারীদের কাছে। যেখানে সুস্থ বুদ্ধির চর্চা নেই সেখানে সহজেই বুদ্ধিজীবীদের গালি দেওয়া যায়। তাই সুশিক্ষিত হওয়া এখানে এক অপরাধের বিষয়। যা বল্টু খোলা মস্তিস্কধারীদের মস্তিস্কের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয় সেটা তাদের কাছে ভুল, সেটা তাদের কাছে গুরুত্ব হারায়। তারা তাচ্ছিলস্বরে উপাধি দেয় অটোপাশ ডাক্তার অটোপাশ ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের এখানে বল্টু খোলা মস্তিষ্কের মজুদ আছে অফুরন্ত। তারাই আমাদের ডাক্তার, তারাই ইঞ্জিনিয়ার, তারাই সাহিত্য ভালো বুঝে, তারাই বিজ্ঞানীদের ভুল ধরে দেশের অফুরন্ত উপকার করতে পারে।

Leave a Reply